কাদের হাতে হাত মেলাচ্ছেন অধীরবাবু?

0
43

নিখিলেশ রায়চৌধুরী

তৃণমূল কংগ্রেসকে হারাতে কংগ্রেস-বাম একসঙ্গে নামবে বলে ঠিক করেছে৷কংগ্রেসের সঙ্গে সিপিএম সহ বামফ্রন্টের সরাসরি রাজনৈতিক আঁতাঁত বাংলায় এই প্রথম৷এর আগে সিপিএম সহ বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে কংগ্রেসের সহযোগী হিসাবে ভোটে অংশ নিয়েছিল সিপিআই৷বাহাত্তর এবং সাতাত্তরে৷তার জন্য সিপিআইকে সিপিএমওয়ালারা দুয়ো দিত৷শ্রীপাদ অমৃত ডাঙ্গে তখন সিপিআইয়ের চেয়ারম্যান৷ সিপিএমওয়ালারা তখন সিপিআইকে বলত ‘ডাঙ্গের বাচ্চা’, ‘ডেঙ্গু’ ইত্যাদি৷পরে সিপিএম এ রাজ্যের ক্ষমতায় এলে রাজেশ্বর রাওয়ের সিপিআই প্রায় রাতারাতি ডাঙ্গেকে দল থেকে বিতাড়িত করে এবং সিপিএমের সঙ্গে ভিড়ে যায়৷ ঘোমটার আড়াল থেকে সিপিএম বহুবারই কংগ্রেসের অঙ্কশায়িনী হয়েছে, কিন্তু সরাসরি রাজনৈতিকভাবে কংগ্রেসের সঙ্গে জোটে যাওয়া তাদের এই প্রথম৷

এসএ ডাঙ্গে, ভবানী সেন কিংবা মোহিত সেনের মতো কমিউনিস্ট নেতারা কংগ্রেসের সঙ্গে জোটের পক্ষপাতী ছিলেন রাজনৈতিক ও তাত্ত্বিক কারণে, সেখানে ভোটের অঙ্ক কখনই তেমন বড় আকারে দেখা দেয়নি৷তাঁরা বিশ্বাস করতেন, দেশের অখণ্ডতা বজায় রাখতে এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী-ধর্মান্ধ শক্তিকে রুখতে কংগ্রেসের হাত ধরতে হবে৷কংগ্রেসের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্কের খাতিরে তাঁদের কারও লাইন ছিল ‘ঐক্য-সংগ্রাম-ঐক্য’, কারও ছিল ‘সংগ্রাম-ঐক্য-সংগ্রামে’র যুক্তি৷কিন্তু তাঁরা প্রত্যেকেই যে কথাটা বলেছেন, স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, অকপটে বলেছেন, কোনও রকম নলচের আড়াল নেননি৷সিপিএম এত দিনে সেই ডাঙ্গের লাইনেই হাঁটছে, বলা ভালো হাঁটতে বাধ্য হচ্ছে, কিন্তু ডাঙ্গে-ভবানী সেন কিংবা মোহিত সেনের প্রতি সামান্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সৌজন্যটুকু দেখানোর প্রয়োজনও সিপিএম-সহ বামফ্রন্ট নেতারা বোধ করছেন না৷

অবশ্য সিপিএমের এটা বরাবরেরই স্বভাব৷সাতাত্তরে তারা প্রফুল্লচন্দ্র সেনকে ঢাল হিসাবে ব্যবহার করে ভোটে প্রচারে নেমেছিল৷সিপিএমের বীরপুঙ্গবদের তখন এমন অবস্থা যে, জ্যোতিবাবু নিজে প্রচারে বের হতে চাইতেন না৷ বলতেন, ‘ওরা (কংগ্রেসিরা) মারবে!’ শীর্ণকায় গান্ধীবাদী প্রফুল্লচন্দ্র সেন অভয় দিয়ে তাঁকে ঠেলে বের করতেন৷আশ্বাস দিতেন, ‘ভয় পাচ্ছেন কেন? মারলে আমাকে মারবে৷আপনি চলুন৷’ জেতার পর জ্যোতিবাবুরা ছেঁড়া ন্যাতার মতো প্রফুল্লচন্দ্র সেনকে পরিত্যাগ করেছিলেন৷তাঁদের জয়ের পিছনে যে প্রফুল্লচন্দ্র সেনের বিপুল অবদান ছিল, সে কথা কোনও দিনই স্বীকার করেননি৷সেই সিপিএম আজ ডাঙ্গেরই লাইন নিয়ে তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে, এটা আশা করাই বাতুলতা৷

সব থেকে মুশকিল হল, এই ভোটে সিপিএমের সঙ্গে আঁতাঁত হলে প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অধীর চৌধুরী তাঁর আপন গড় মুর্শিদাবাদের অনুগামীদের কী কৈফিয়ত দেবেন? আজ অধীর চৌধুরীর লড়াই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে৷ কিন্তু একটা সময় মুর্শিদাবাদের এই নেতার উত্থান কিন্তু সিপিএমের বিরুদ্ধে নখে-দাঁতে লড়াই করেই৷বহুবার ভোটে সিপিএমের হার্মাদ বাহিনী তাঁকে প্রাণে মেরে দিতে চেয়েছে, অধীর চৌধুরী জবাব দিয়েছেন পালটা মারে৷একটা সময় রক্তপাগল সিপিএমের মিছিলে স্লোগানই ছিল দাঁত কা বদলা দাঁত, আঁখ কা বদলা আঁখ৷অধীর চৌধুরী সেই হুমকির পালটা তুড়ুং ঠুকেই ক্ন্তিু আজকের অধীর চৌধুরী হয়েছেন৷ সেই সিপিএম-কিলার অধীর চৌধুরী কী জবাব দেবেন তাঁর অনুগামীদের? হাতের মাঝখানে কাস্তে-হাতুড়ি-তারা? তাঁর বহু অনুগামীর রক্ত যারা ঝরিয়েছে, সেই তাদেরই তিনি এখন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু হয়ে বুকে জড়িয়ে ধরবেন?

কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী আগামী দিনের কথা ভেবে ঠিক কোন সমীকরণের চিন্তা করছেন তা তিনিই ভালো বলতে পারবেন৷এটা অন্তত ভালোমতোই বোঝা যাচ্ছে যে, ‘গোপালন ভবন’ আর ‘অজয় ভবন’ আবার তাঁর পায়ে পড়ে গিয়েছে৷ কিন্তু এই রাজ্যে সিপিএম-কংগ্রেসের ভোট আঁতাঁত কংগ্রেসের তৃণমূল স্তরে কী প্রভাব ফেলতে হতে পারে, তা কি সোনিয়া গান্ধী ভেবে দেখেছেন? তৃণমূল কংগ্রেসের জয়জয়কারের সময়েও যেসব কংগ্রেস কর্মী-অনুগামী কংগ্রেসের ঝান্ডা ছাড়েননি, তাঁরা কিন্তু কোনও তৃণমূল কর্মী-অনুগামীর চাইতে সিপিএমকে কিছু কম ঘৃণা করেন না৷কারণ সিপিএমের হার্মাদ-ভৈরব বাহিনীর তাণ্ডব তাঁদেরই সহ্য করতে হয়েছে সব চাইতে বেশি৷এই অবস্থায় সিপিএমের ঝাণ্ডাধারীদের পাশে পাশে তাঁদের যদি এখন দাঁত বের করে ঝাণ্ডা কাঁধে বের হতে হয়, ভোট চাইতে হয়, তাহলে তার চাইতে গ্লানির আর পরিতাপের বিষয় আর কিছু তাঁদের কাছে থাকবে না৷এটা জেনে ভালো লেগেছে যে, প্রদেশ কংগ্রেসের অন্তত তিন জন ‘ম্যাডামে’র মতে মত না দিয়ে একলা চলতে চেয়েছেন৷

সোনিয়া গান্ধী এ রাজ্যের রাজনৈতিক ইতিহাসটা ততটা নাও জানতে পারেন৷ তাঁর পক্ষে সেটাই স্বাভাবিক৷কীভাবে অজয় মুখার্জির কাঁধে চেপে যুক্তফ্রন্টে জাঁকিয়ে বসে সিপিএম তাঁকেই পদে পদে চূড়ান্ত অপমানিত করেছিল, সেটা সোনিয়া গান্ধীর পক্ষে না জানাই স্বাভাবিক৷কিন্তু এ রাজ্যের কংগ্রেস নেতাদের অনেকেরই তো সেটা অজানা নয়৷ তাও কেউ কেউ যদি সেসব দিনের কথা ভুলেও গিয়ে থাকেন, তাহলে তাঁদের আবার বরুণ সেনগুপ্তর ‘পালাবদলের পালা’টা পড়ে নিতে অনুরোধ করব৷

আমার বাবা ছিলেন ডাঙ্গেপন্থী কমিউনিস্ট৷সঙ্কর্ষণ রায়চৌধুরী৷ গত ১৬ ফেব্রুয়ারি তাঁর মৃত্যু হয়েছে৷ প্রথম যুক্তফ্রন্ট ভাঙার পরের দিন পুলিশের প্রচণ্ড মারে তাঁকে ক্ষতবিক্ষত হতে হয়েছিল৷ প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছে, অত মার খেয়েও টুঁ শব্দটি করেননি৷ তাই পুলিশ উপড়ে নিয়েছিল মুঠো মুঠো চুল৷ তার পর প্রেসিডেন্সি জেলে কেটেছিল তাঁর চুয়াল্লিশটা দিন৷আমি তখন মাতৃগর্ভে৷পরে বাবার সেই দিনগুলির স্মৃতিকথা পড়েছিলাম৷ প্রকাশিত হয়েছিল ‘কবিতা সীমান্তে’৷ সেই ধারাবাহিক রচনারও নাম ছিল ‘প্রেসিডেন্সি জেলে ৪৪ দিন’৷ আর যখন ওই লেখা পড়ার মতো বোধশক্তি হয়েছে, তখনই বাবার কাছে শুনেছিলাম, প্রথম যুক্তফ্রন্ট ভাঙার প্রতিবাদের দিন শামিল হয়নি যে দল, তার নাম সিপিএম৷এর পরেও অধীরবাবু…?