শিশুমন বিষিয়ে তোলার নাৎসি পন্থা এবার আইএসের সহায়

0
41

নিখিলেশ রায়চৌধুরী

বিলাতি সংবাদপত্র ‘দ্য ইন্ডিপেনডেন্টে’ একটি খবর বেরিয়েছে, ইসলামিক স্টেট একেবারে নাৎসি কায়দায় তাদের অধিকৃত অঞ্চলে শিশুদের মগজ ধোলাই করছে৷ একেবারে ছোট থেকে তারা যাতে হিংসায় পোক্ত হয়ে ওঠে, তার জন্য যা যা করার তা-ই করছে আইএস৷আইএসের দখল করা তল্লাটে যে এ ব্যাপার অনবরত ঘটছে, এ ধরনের খবর এর আগেও বেরিয়েছিল৷এমনকী, তাদের তোলা ভিডিও-ও এর আগে একাধিকবার ভাইরাল হয়েছে৷কিন্তু তারা যে রীতিমতো নাৎসি প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই এই কাণ্ড ঘটাচ্ছে, তা সাম্প্রতিক খবরটি থেকে আরও পরিষ্কার হয়ে গেল৷

হিটলারের আমলে জার্মানিতে একেবারে কচিকাঁচাদের মধ্যেও হিংসার বীজ বপন করতে খুব পরিকল্পনামাফিক কিছু কিছু পদক্ষেপ নিয়েছিল হিটলারের অনুগত গোয়েবলস এবং হিমলারের পোষ্যরা৷ শুধু হিংসায় রপ্ত করাই নয়, স্কুলের একেবারে শিশু শ্রেণি থেকে এভাবেই তৈরি করা হত, বাড়িতে মা-বাবা কী কথাবার্তা বলছে, তারা যেন সে খবরও স্কুলে এসে জানায়৷ শিশুমনে এই বিষ ঢোকানোর পরিণাম নানাভাবে তাদের অভিভাবকদের ভুগতে হয়েছিল৷ অনেকেরই ঠাঁই হয়েছিল কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে, তার পর প্রাণও গিয়েছিল৷

এই একই ধরনের প্রক্রিয়া আরও ব্যাপকভাবে দেখা যায় মাও সে তুংয়ের চীনে৷বিশেষ করে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের পর্বে৷ তখন সেখানে একেবারে লিখিত-পড়িত ভাবেই ‘রেড বুকে’র পাশাপাশি তরুণ-তরুণীদের হিটলারের ‘মেইন কাম্ফ’ পড়ানো হত৷ বিষকুম্ভ একেবারে কানায় কানায় পূর্ণ করে তুলতে কোনও অসুবিধাই হত না৷যদিও ইয়েনানে থাকতেই চিয়াং-কাই-শেকের বিরুদ্ধে লড়ার সময় মাও সে তুং যে আসলে হিটলারের ভক্ত, তেমন বহু ইঙ্গিতই একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী পেয়েছিলেন৷ পরে কেউ কেউ সে কথা বাইরের দুনিয়াকে জানানোর সুযোগ পেয়েছিলেন, বেশিরভাগেরই অবশ্য সে সৌভাগ্য আর হয়নি৷

সমসাময়িক বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চাইল্ড সোলজারদের কথা জানা যায়৷ কিন্তু আইএসের আগে একেবারে শিশুবয়স থেকে নাৎসি কায়দায় তালিম দিয়ে পাইকারি হারে ঠান্ডামাথার ঘাতক তৈরির কথা সেভাবে প্রকাশ পায়নি৷ এর আগের যত চাইল্ড সোলজারদের কথা জানা গিয়েছে, তারা বেশিরভাগই ছিল পরিবেশ-পরিস্থিতির শিকার৷

মাওয়ের চীন ছাড়া নাৎসি কায়দায় শিশুমন বিষিয়ে দেওয়ার আর একটি নজির গড়েছিল আয়াতোল্লা খোমেইনির ইরান৷ সেখানেও এমনভাবে স্কুলস্তর থেকে শিশুদের মনে হিংসার বীজ বপন করা হয়েছিল যে, ইরাক-ইরান যুদ্ধের সময় তাদের অনেককে মাথায় খোমেইনির নাম লেখা পট্টি বেঁধে মানব বোমা হিসাবে ইরাকি সেনাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে দেখা গিয়েছিল৷শিশুদের ঘাতক করে তোলার জন্য খোমেইনির ইরানও সেই একই পন্থা নিয়েছিল, যা আসলে হিটলারের সাঙ্গোপাঙ্গই মাথা খাটিয়ে বের করেছিল৷

দক্ষিণ এশিয়ায় এই একই পন্থা নিয়েছিল ভেলুপিল্লাই প্রভাকরণ৷শ্রীলঙ্কায়৷ তার এলটিটিইতে এ রকম অসংখ্য আত্মঘাতী জঙ্গি ছিল, যারা একেবারেই অপ্রাপ্তবয়স্ক৷ কিন্তু একেবারে ছোটবেলা থেকেই তাদের মনোজগতকে এমনভাবে দুমড়ে-মুচড়ে দেওয়া হয়েছিল যে, ড্রাকুলা কিংবা ভ্যাম্পায়ারের মতো রক্ততৃষা না মেটা পর্যন্ত তারা থামত না৷

বহু বছর আগে একটা সিনেমা দেখেছিলাম৷ হলিউডের ছবি৷ জ্যাকব’স ল্যাডার৷প্লটটা ছিল এ রকম৷ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় পেন্টাগন মাথা খাটিয়ে একটা অদ্ভুত নার্ভ গ্যাস আবিষ্কার করেছে৷ সেই গ্যাস বোমা যদি একবার শত্রুদের এলাকায় ফেলা যায়, তাহলে তার প্রতিক্রিয়ায় তারা একে অপরকে সাংঘাতিক দুশমন হিসাবে দেখতে শুরু করবে এবং নির্বিচারে পরস্পরকে কচুকাটা করবে৷কিন্তু দুঃখের বিষয়, বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রে বোমাটা গিয়ে পড়ল মার্কিন শিবিরে৷আর তার প্রতিক্রিয়ায় মার্কিন সেনারাই পরস্পরকে মারতে শুরু করে দিল৷কিন্তু হিটলারের চ্যালাচামুণ্ডারা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে যা ছকে গিয়েছিল, তা যে ওই হলিউডি সিনেমার কাহিনিকেও হার মানায়, আইএস সম্পর্কে হালের খবরটি থেকে তা জলের মতো পরিষ্কার হয়ে গেল৷ অ্যাডলফ হিটলার নামক বিষাক্ত গ্যাসটি যে এখনও প্রতিপদে গোটা বিশ্বকে জর্জরিত করে তুলতে পারে, এই ঘটনাই তার একটি বড় প্রমাণ৷